
জেমস আব্দুর রহিম রানা:: যশোরের মনিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুর্নীতি দমন কমিশনের ( দুদক ) আকস্মিক অভিযানে হাসপাতালে চলমান নানামুখী অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির চিত্র স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।
রবিবার সকাল থেকে ছদ্মবেশে পরিচালিত এই অভিযানে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় যশোরের বিশেষ টিম হাসপাতালের খাদ্য সরবরাহ, চিকিৎসা সেবা, ব্যবস্থাপনা, জরুরি বিভাগ এবং চিকিৎসক উপস্থিতি—সব পর্যায়েই চরম অসঙ্গতি খুঁজে পায়। রোগীদের জন্য বরাদ্দ থাকা খাবারের মান ও পরিমাণ সরাসরি অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছিল।
সকালের নাস্তায় ১৫২ গ্রাম পাউরুটি বরাদ্দ থাকলেও রোগীদের দেওয়া হয়েছে মাত্র ৫৬ গ্রাম। দুপুরের খাবারে চিকন মশুর ডালের পরিবর্তে সরবরাহ করা হয়েছে অতি নিম্নমানের মোটা ডাল, যার দাম বাজারদরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। মাছের ১১৮ গ্রাম বরাদ্দ থেকেও দেওয়া হয়েছে মাত্র ৬০-৮০ গ্রাম। রান্নায় ব্যবহৃত চাল ছিল নিম্নমানের। এমনকি লবণের মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। হাসপাতালের ওয়াসরুমগুলো ছিল এমন নোংরা যে রোগীরা প্রবেশ করতেও ভয় পাচ্ছিলেন।
দুদকের অভিযানে আরেকটি উদ্বেগজনক অনিয়ম সামনে আসে—গুদামে পর্যাপ্ত স্যালাইন মজুদ থাকা সত্ত্বেও রোগীদের সেগুলো সরবরাহ করা হয়নি। বরং নির্দিষ্ট দোকান থেকে কিনে আনতে বাধ্য করা হয়েছে। এতে হাসপাতালের ভেতরে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় আছে বলে ধারণা পাওয়া যায়।
চিকিৎসা সেবায়ও ছিল ভয়াবহ শৈথিল্য। জরুরি বিভাগে কোনো ডিগ্রি-ধারী চিকিৎসককে পাওয়া যায়নি। দায়িত্বে ছিলেন একজন স্যাকমো, মাসুদুর রহমান। আরও অবাক করা তথ্য হলো, বাহিরের ল্যাবে পরীক্ষা করাতে পাঠানোর উদ্দেশ্যে সক্রিয় ছিল দালালচক্র। এদের একজন নয়ন হোসেনকে ঘটনাস্থলেই আটক করা হয়। তিনি নিজেকে নিকটস্থ একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ম্যানেজার পরিচয় দিলেও বাস্তবে রোগী টানাটানিই ছিল তার প্রধান কাজ।
দুদকের টিম রোগী সেজে এ্যাম্বুলেন্স চালক এখলাসের সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রকাশ পায় অনিয়মের আরেক রূপ। রোগী পরিবহনে সরকারি নির্ধারিত ভাড়া অমান্য করে তিনি বেশি টাকা দাবি করেন। সরকারি নিয়মের কথা বললে এ্যাম্বুলেন্স চালক জানান—“ওসব নিয়ম এখানে চলে না।”
অভিযানের সময় দুদকের সদস্যরা আরএমও’র উপস্থিতিতে রান্নাঘরের খাবারের পরিমাপ করেও একই অনিয়ম তুলে ধরেন। এসব বিষয়ে একটি প্রেসব্রিফিং করেন টিম লিডার ডিএডি চিরঞ্জীব নিয়োগী। তার সঙ্গে ছিলেন ডিএডি তৌহিদুল ইসলাম ও এএসআই রমেচা খাতুন।
খাদ্য সরবরাহকারি ঠিকাদার ইসমাইল হোসেন সাংবাদিকদের জানান, ১২ বছর আগের টেন্ডারের মূল্য অনুযায়ী এখনো খাবার সরবরাহ করতে বাধ্য হচ্ছেন। বাজারদর বেড়ে যাওয়ায় মান বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তবুও মামলা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ভয়ে চুক্তি ছেড়ে আসতে পারছেন না বলে দাবি করেন তিনি। তবে এই বক্তব্যে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অনেকেই। তাদের মতে, বাজারদর যেমনই হোক, অর্ধেক খাবার সরবরাহের কোনো যুক্তি নেই।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ ফয়েজ আহমদ ফয়সল দুদকের অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে জানান, দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আটক করা দালালকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. মাসুদ রানা বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অভিযান শেষে হাসপাতালের রোগী ও স্বজনদের মধ্যে স্বস্তি ও ক্ষোভ দুটোই প্রকাশ পায়। তাদের মতে, এ ধরনের অভিযান নিয়মিত হলে দুর্নীতি কিছুটা হলেও কমবে। দুদকের এই অভিযান সরকারি হাসপাতাল ব্যবস্থার দুর্বলতা ও দুর্নীতিবৃত্তিক চক্রকে আবারও প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে, যা সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।